Breaking News
Home / ক্রিকেট / বিনোদন নয়, এক জীবনের ফেরিওয়ালা

বিনোদন নয়, এক জীবনের ফেরিওয়ালা

বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে তিনি এলাকার বড় ভাই।

দফায় দফায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল নিয়ে বাংলাদেশে এসে এক মাস, দেড় মাস করে থেকেছেন; একবার তিন মাসও ছিলেন। বিপিএল খেলতে তো আসেন বছর বছর।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সফরের সময় রোজ ম্যাচশেষে, ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে আসতেন। রোজ একই ধরণের কথা, মাঝে মাঝে বিরক্তও লাগতো। কিন্তু স্যামির অদ্ভুত কিছু ভঙ্গি আছে না? ওসব কারণে বিরক্তি ছাপিয়ে কখন যেনো এই আমাদের মহল্লার মোড়ে আড্ডা দেওয়া মানুষটার মতো আপন হয়ে গেছেন।

এবার বিপিএলে খেলার জন্য ঢাকায় এসেই পরিচিত সাংবাদিকদের খুজে খুজে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন, সেলফি তুলেছেন। যেনো ‘মেলায় হারানো ভাইদের’ খুজে পেয়েছেন।

ভাইয়েরাও এতোদিন পর বড় ভাইকে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এবার নতুন কী সেলিব্রেশন হবে?’

কখনো গ্যাংনাম, কখনো চ্যাম্পিয়ন; নিত্যনতুন উদযাপনের নাচ আবিষ্কারে ক্যারিবিয়দের তো জুড়ি নেই। আর স্বভাবতই এসব মাতিয়ে দেওয়া উদযাপনের আবিষ্কার করেন ড্যারেন স্যামি। কিন্তু স্যামি সেদিন চমকে দিয়ে বললেন, এবার তিনি, ব্র্যাভো বা গেইল নন; নতুন সেলিব্রেশন দেখাবেন সদ্য কৈশোর পার করা আরেক ক্যারিবিয়ান কেসরিক উইলিয়ামস।
একটানা রাজশাহীর বেঞ্চে বসে থাকায় উইলিয়ামস সেটা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছিলেন না।

অবশেষে দু ম্যাচ আগে মাঠে নামলেন উইলিয়ামস। সিপিএল থেকে বিপিএলে আমদানি করে ফেললেন ‘সেলফি সেলিব্রেশন’। গতকালও ওই সেলফি সেলিব্রেশন দিয়েই শুরু হয়েছিলো। চিটাগংয়ের একটা করে উইকেট পড়ে, আর উইলিয়ামস একটু বাঁকা হয়ে দাড়িয়ে শূন্য হাতে অদৃশ্য মোবাইল ধরে সেলফি তোলেন!

কিন্তু স্যামি তো পিছিয়ে থাকতে পারেন না।

একসময় তাই উইলিয়ামসকে একটু থামিয়ে দিলেন। সেলফি তোলার ভঙ্গি করতে থাকা বাকী সব ক্রিকেটারকে এক জায়গায় জড়ো হতে বললেন। এবার নিজে একটু পিছিয়ে গিয়ে পেশাদার চিত্রগ্রাহকদের মতো কোমর বাকিয়ে, সামনে ঝুকে দাড়ালেন। তারপর হাতে অদৃশ্য এক ক্যামেরা নিয়ে ‘শাট-শাট’ শব্দ করে ছবি তুলতে শুরু করলেন। চালু হলো নতুন উদযাপন-ফটো সেলিব্রেশন।

ড্যারেন স্যামি এমনই।

কখনো ছবি তোলার ভঙ্গি করছেন, কখনো অন্যের ক্যামেরা নিয়ে দুষ্টুমি করছেন, কখনো মাঠের ভেতর শুয়ে পড়ছেন, আবার জুনিয়র কাউকে কাঁধে নিয়ে হাতছেন, কখনো সামনে পেছনে কোমর দুলিয়ে নাচছেন। আবার পুরষ্কার নিতে গিয়ে নিজেই হাতে তালি দিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে এসে একটু ছবি তোলার ভঙ্গি করে হাসাচ্ছেন, তামিমকে দ্রুত কথা শেষ করার ইশারা করে মুচকি হাসছেন। সদা-সর্বদা হাসছেন এবং হাসাচ্ছেন।
হাসিটা শুধু মাঠে ও মাঠের বাইরের এসব কর্মকান্ডে নয়। নেতা হিসেবে সতীর্থদের হাসাচ্ছেন, খেলোয়াড় হিসেবে ব্যাটে-বলে পারফরম করে দলকে জয়ের হাসি হাসাচ্ছেন। ড্যারেন স্যামি এক হাসি ছড়িয়ে যাওয়া মানুষ।

এই বিপিএলে গতকালকেরটি সহ তিনটি বড় ইনিংস খেলেছেন; দুটি ফিফটি-৪৪*, ৭১* ও ৫৫*!

তিন দিনই কার্যত রাজশাহীকে জিতিয়েছেন মারাত্মক ব্যাটিং ধ্বসের পর। রংপুরের বিপক্ষে ১৮ বলে ৪৪ এবং খুলনার বিপক্ষে ৩৪ বলে ৭১ রানের দুটো অপরাজিত ইনিংস রূপকথার অংশ হয়ে যাওয়ার মতো। গতকাল নিজেকে ছাপিয়ে গেলেন যেনো। আগের দু দিন আগে ব্যাট করে বড় সংগ্রহ এনে দিয়েছেন দলকে। আর গতকাল রান তাড়া করতে গিয়ে ৫৭ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর খেলেছেন এই ৫৫ রানের অপরাজিত ইনিংস।

মূলত বোলিং অলরাউন্ডার। কিন্তু ব্যাট হাতে এই রুদ্র মূর্তি অপরিচিত নয়। দুই দুটো বিশ^কাপ জেতানোর পথে এই স্যামিকে দেখেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সিপিএল, বিপিএলে বহুবার এসেছেন এই রূপে। দল বিপর্যয়ে মানেই ম্যাচ জেতাতে হাজির স্যামির ব্যাট। প্রশ্নটা উঠতে খুব হাসলেন। একটু সিরিয়াস হওয়ার অভিনয় করে বললেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ধোনির খুব ভক্ত। ওর একটা দর্শন বিশ্বাস করি-যতক্ষন সুযোগ আছে, হাতে ব্যাট আছে, ম্যাচটা কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করো। আমি মনে করি, যতোক্ষন শেষ বলটা ডেলিভারি না হচ্ছে, ততোক্ষন আমি আছি। আমি জীবনেও হাল ছাড়ি না। অভিজ্ঞতা তো কম হলো না। একটা ব্যাপার বুঝেছি, হাল ছাড়া যাবে না। ১৯০ বা ২০০ ম্যাচ খেলে ফেলেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে, ফ্রাঞ্চাইজি দলগুলোর হয়ে খেলেছি। সবসময় এই চেষ্টায় কাজ হয়, তা নয়। কিন্তু চেষ্টা তো কাউকে করতেই হবে।’

শুধু এই কথার জন্যই তো একটা স্যালুট পেতে পারেন। কিন্তু এসব ভারগম্ভীর কথা শোনা, স্যালুট নেওয়ার মতো ব্যাপার করার সময় কই স্যামির! তিনি আবার খালি হাতে সেলফি তুলতে ব্যস্ত।

এই বেলা একটু উদযাপন নিয়েও দু কথা বলে দিলেন। বললেন, এই ফটো সেলিব্রেশন ছাড়া আজকের যুগে একটু সেকেলে হয়ে যেতে হয়, ‘আপনারাই তো ফটো খুব পছন্দ করেন, ফটো তোলেন। সবসময় সবাই দেখি ইনস্ট্রাগাম, ফেসবুকে ফটো দেয়। তাহলে ক্রিকেট মাঠ আর বাকী থাকে কেনো! আমরাও একটু ফটো তোলা শুরু করলাম।’
স্যামিকে যারা এই সব কান্ড দেখে শুধু একজন ‘জোকার’ ভাবেন, তারা আসলে ভাবরাজ্যের বাইরে থেকে ঘুরছেন। স্যামি একজন চার্লি চ্যাপলিন; বাইরে বাইরে খুব কমেডিয়ান। বাইরে বাইরে এই হাসি বিলিয়ে যাচ্ছেন। ভেতরে ভেতরে দাড় করিয়ে যাচ্ছেন এক জীবনদর্শন।

এইসব মজা করতে করতেই ব্যাঙ্গ করেন ধ্বসে পড়া ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট কাঠামোকে। এইসব মজা করতে করতেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন আজদের দিনের অতিপেশাদার, মুখ গোমড়া খেলাধুলার সংকটকে।

উদযাপন নিয়ে কথা বলতে বলতে একটু মুচকি হেসে বলেন, ‘এইসব মজা আসলে মানুষকে চাপ থেকে বের করে আনে। জীবনটাকে এতো সিরিয়াস করে ফেললে সাফল্য আসে না। ভেবে দেখুন, সেলফি তোলার সময় লোকে কতটা উৎফুল্ল থাকে! আমাদের ব্যাপারটিও তাই। আমরা খেলায় তো সবসময় ভালো অবস্থায় থাকি না। কখনো চাপে পড়ি, কখনো টানটান টেনশন হয়। তখন আপনারা সেলফি তুলে যে স্বস্তিটা পান, সেটাই পেতে চাই আমরা। এক এক সময় এক এক ধরণের সেলিব্রেশন করে বের হই।’

এটাই জীবন।

লিখেছেন: দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

Comments

comments

Check Also

প্রস্তুতি ম্যাচে কিউইদের ২৪৫ রানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল বাংলাদেশের (দেখুন সরাসরি)

নিউজিল্যান্ড সফরে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে আট উইকেট হারিয়ে ২৪৫ রান করেছে বাংলাদেশ। …